Website Launching Program
Ethics Club Bangladesh
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১ জানুয়ারি ২০১১
“অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।”
ড. আতিউর রহমান
সাবেক গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংক
বিস্তারিত
ড. আতিউর রহমান
সাবেক গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংক
আজ দেশে কিংবা বিদেশে যেদিকে চোখ রাখি নৈতিকতার স্খলন চোখে পড়ে। নীতি আর অনীতির সীমারেখটা এতটাই সরু হয়ে গেছে যে আমরা অনেকেই এখন তার ব্যবধানটা অনুভব করতে পারি না। কেবল নিজেকে পরিশুদ্ধ রেখে সমাজে চলা কষ্টসাধ্য হয় যদি পুরো সমাজে সাধুতা হারিয়ে যায়। এই ভয়াবহ বাস্তবতা রবীন্দ্রনাথ শতবর্ষ আগেই অনুভব করেছেন। তাই বলেছেন,
“অন্যায় যে করে
আর অন্যায়
যে সহে
তব ঘৃণা যেন তারে
তৃণসম দহে।”
এক সময় সমাজ থেকেই নৈতিকতার শিক্ষা নেওয়া হতো। অথচ আজ পারিবারিক সুশিক্ষা থাকা সত্ত্বেও সমাজে বিদ্যমান নীতিহীন পরিবেশ ব্যক্তি জীবনের জন্যেও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, শাসন ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য সবেেত্রই অনীতির বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ছে। সংকটের তীব্রতা ভেদে নৈতিকতায় বিচূ্যতি ও তারতম্য হয়, এদের মধ্যে যোগসূত্র আছে। এক সময় সংকটের মধ্যেও সমাজ নৈতিকতার কাণ্ডারির ভূমিকা নিত।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,
“আমরা যে হাজার বৎসরের বিপ্লবে, উৎপীড়নে, পরাধীনতায়, অধঃপতনের শেষ সীমায় তলাইয়া যাই নাই, এখনো যে আমাদের নিম্নশ্রেণীর মধ্যে সাধুতা, ভদ্রমণ্ডলীর মধ্যে মনুষ্যত্বের উপকরণ রহিয়াছে, আমাদের আহারে সংযম এবং ব্যবহারে শীলতা প্রকাশ পাইতেছে, এখনো যে আমরা পদে পদে ত্যাগ স্বীকার করিতেছি, বহু দুঃখের ধনকে সকলের সঙ্গে ভাগ করিয়া ভোগ করাই শ্রেয় বলিয়া জানিতেছি, সাহেবের বেহারা সাত টাকা বেতনের তিন টাকা পেটে খাইযা চার টাকা বাড়ি পাঠাইতেছে, পনেরো টাকা বেতনের মুহুরি নিজে আধমরা হইয়া ছোটো ভাইকে কলেজে পড়াইতেছে – সে কেবল আমাদের প্রাচীন সমাজের জোরে।”
মানুষের মৌলিক চাহিদাসমূহ যেমন শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা ব্যবস্থার বর্তমান বাণিজ্যিক প্রবণতা ও কাঠামোগত ত্রুটি সমাজের নৈতিক অবয় ত্বরান্বিত করছে। Political সাধনার চরম উদ্দেশ্য একমাত্র দেশের হৃদয়কে এক করা। কিন্তু বর্তমানে সেই মহান আদর্শ কি রাজনীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে?
দুর্নীতির বিষয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। এক সময় সমাজের হাতেগোনা অসাধু লোকদের চিহ্নিত করা হতো। সামাজিকভাবে তাদের হেয় দৃষ্টিতে দেখা হতো। আর বর্তমানে সমাজে তার বিপরীত চিত্র দেখা যায়। এখন সমাজের সৎ লোক হাতে গোনা যায়। নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর প্রয়োজন রয়েছে। সুশিক্ষার মাধ্যমে এই মনোবদল বেশ খানিকটাই করা সম্ভব।
নিঃসন্দেহে আমাদের দেশে শিক্ষার গুণগতমানের অবনমন ঘটেছে। ফলে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থায় নানা ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে সামাজিক বৈষম্য ও নীতিহীনতা। শিক্ষার মানের তারতম্যের কারণে এক বাংলাদেশে কয়েক বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন এই বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, আশা-আকাংখা ভিন্নতর হতে বাধ্য। গুণগতমানের নৈতিক ও আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে সমাজের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চয় আসবে। কেটে যাবে সমাজের বিদ্যমান কূপমণ্ডুকতা।
নৈতিকতার এই অবয় থেকে উত্তরণে আমাদের মধ্যে নৈতিক জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ সমাজকে সততায় উদ্দীপ্ত করতে হবে। তাদের যথাযথ কর্মসংস্থান, নৈতিক শিক্ষা ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, হতাশাগ্রস্ত তারুণ্য বিভ্রান্তির পথে চলে। তখন বৃহত্তর কল্যাণ ভাবনার পরিবর্তে তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ, ক্ষোভ আর অন্যায় বাসা বাঁধে। তাই প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। আর সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে থাকবে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ভারসাম্যপূর্ণ সাম্যভিত্তিক উন্নয়নের চেতনার চাবিকাঠিও ঐ একাত্তরের মনোভুমিতে স্থাপিত। তাই নিরন্তর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের চালিয়ে যেতে হবে অন্যায়, অবিচার, অনৈতিকতা ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে।
এক্ষেত্রে Ethics Club Bangladesh নেতৃত্ব দিতে পারে। আমি আশা করি আজ পহেলা জানুয়ারি Ethics Day উদযাপন এবং ক্লাবের ওয়েবসাইট উদ্বোধনের মাধ্যমে একটি ন্যায়নিষ্ঠ ও সাম্যচিন্তার সমাজ প্রতিষ্ঠায় Ethics Club Bangladesh অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। এই ক্লাবের যে সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা আজ উপস্থাপন করা হলো তা আগামী প্রজন্মের জন্যে মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন একটি শিক্ষিত ও সৎ সমাজ বিনির্মাণে অবদান রাখবে। আপনারা অনাবাসী বাংলাদেশীরা (NRB) যেভাবে আপনাদের বহু কষ্টে অর্জিত আয়/বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির ভিতকে সুদৃঢ় করছেন, তেমনি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নৈতিকতার মান উন্নয়নে যে পদক্ষেপ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন তার জন্যে আপনাদের সাধুবাদ জানাই।
বিজয়ের মাসে নতুন বছরের সন্ধিক্ষণে প্রবাসী ভাইবোনদের এই অনন্য ভাবনা আমাকে রবীন্দ্রনাথের এই কবিতাটি মনে করিয়ে দেয়:
তোমার অন্ত নাই গো অন্ত নাই,
বারে বারে নূতন লীলা তাই।
আবার তুমি জানি নে কোন্ বেশে
পথের মাঝে দাঁড়াবে, নাথ, হেসে,
আমার এ হাত ধরবে কাছে এসে,
লাগবে প্রাণে নূতন ভাবের ঘোর।
তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর।
(রবীন্দ্র রচনাবলী, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ. ৮৭)
"সমাজ উন্নয়নে সমাজর্কমীর ভূমিকা এবং কীভাবে একজন সমাজর্কমী হওয়া যায়"
এম ই চৌধুরী শামীম
প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি
স্কলারস বাংলাদেশ




